
প্রশ্ন
উত্তর
- حامداومصلياومسلما، بسم الله الرحمن الرحيم -
মীলাদের শাব্দিক অর্থ জন্ম। মীলাদুন্নবী মাহফিল-এর উদ্দেশ্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম-এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা। মীলাদের উদ্দেশ্য যদি এই হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম-এর জীবনী আলোচনা করা এবং এর শেষে প্রত্যেকে দরূদ পড়ে দু’আ করে নেয়া, তাহলে এতে শরী‘আতের দৃষ্টিতে কোন অসুবিধা নেই। দরুদ শরীফ দাড়ানো, বসা ও শোয়া- সর্বাবস্থায় পড়া জায়িয। এমনকি বিনা উযুতেও দরূদ শরীফ পড়তে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু আমাদের দেশে মীলাদ ও কিয়াম সাধারণতঃ যে নিয়মে হয়ে তাকে, তাওয়াল্লুদ, কিয়াম কতগুলি আজগুবী বাংলা, উর্দূ, ফার্সী, কবিতা গাওয়া “ইয়ানবী সালামু আলাইকা” ধরনের শাব্দিক ও অর্থগত ভুল দরূদ সালাম পাঠ করা ইত্যাদি, তা বিভিন্ন দিক দিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং কুরআন, হাদীস, ইজমা, ও কিয়াসের নীতি বহির্ভূত। হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত মজলিসে মীলাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। ৬০৪ হিজরীতে ইরবিলের ফাসিক বাদশাহ আবূ সাঈদ মুযাফ্ফরুদ্দীন কুকুরী আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহইয়া নামক জনৈক দরবারী আলেম দ্বারা রাজকীয় ব্যবস্থাপনায় প্রথম মীলাদ মাহ্ফিলের ইন্তেজাম করে। এ থেকেই প্রচলিত মাহ্ফিলে মীলাদের সূত্রপাত। দ্রষ্টব্যঃ ওয়াফায়াতুল আ’য়ান, ৪ঃ১১৭। সে সময় থেকেই হক্কানী উলামায়ে কিরাম এ বিদ’আতের প্রতিবাদে কিতাবাদী রচনা করতে থাকেন। এর প্রতিবাদে আরবী, ফার্সী, উর্দূ ও বাংলা প্রতিটি ভাষায় কিতাবাদী রচিত হয়েছে। প্রচলিত মীলাদ মাহ্ফিল সম্পর্কে আল্লামা আবদুর রহমান মাগরিবী (রহঃ) লিখেন, প্রচলিত মীলাদ মাহ্ফিল অনুষ্ঠিত করা নিঃসন্দেহে বিদ‘আত। কেননা, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম উক্ত কাজের নির্দেশ দেননি বা তিনি তা করেন নি। এমনিভাবে খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবাগণ (রাযিঃ), আইম্মায়ে মুজতাহিদীনও তা করেন নি।(প্রমাণঃ আশ্শির‘আতুল ইলাহিয়্যা ২৫৩ পৃঃ) আল্লামা আহমদ বিন মুহাম্মাদ মিসরী (রহঃ) লিখেন মাযহাব চতুষ্টয়ের উলামাগণ এ কাজ তথা মাহফিলে মীলাদের জঘণ্যতার উপর একমত পোষণ করেন। বিশেষতঃ উলামায়ে কিরাম এ কাজকে এজন্য বিদ‘আত বলছেন যে, যে কাজ দীন বলে প্রমাণিত নয় এমন কাজকে দ্বীনে অনুপ্রবেশ করানো তথা সাওয়াবের কাজ বলে মনে করা মারাত্মক অপরাধ। তা বিদা’আত ও অবশ্য বর্জনীয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যদি কেউ আমার এই দীনের মধ্যে এমন কোন কিছু আবিষ্কার করতঃ অনুপ্রবেশ করায় যা দীনের কাজ নয়, তাহলে সে কাজ হবে প্রত্যাখ্যাত। কিছুতেই তা গ্রাহ্য হবে না।” (বুখারী ও মুসলিম শরীফঃ মিশকাত, ২৭ পৃঃ) উল্লেখ্য যে অনেকে মীলাদে কিয়ামও করে থাকে। মীলাদে এই কিয়াম কেন করা হয়- এ ব্যাপারে কারো কারো বিশ্বাস এই যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ঐ মাহ্ফিলে উপস্থিত হন। তাই তাঁর সম্মানার্থে কিয়াম করা হয়। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এতে শিরকের আশংকা রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন নবীজীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) জন্ম আলোচনার সম্মানার্থে কিয়াম করা হয়ে থাকে। একথাটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কেননা, যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যখন ওয়াযের মাহ্ফিলে হাদীস-তাফসীর পড়া ও পড়ানোর সময় ঘন্টার পর ঘন্টা নবীজীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) জন্ম আলোচনা করা হয়, তখন কেন কিয়াম করা হয় না? তখন কি সম্মান প্রদর্শনের প্রয়োজন থাকে না? তাই প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম নাজায়িয ও বিদ‘আত। যে কোন কাজ তখনই প্রহণযোগ্য হয়, যখন তা শরী‘আত সমর্থিত পন্থায় তথা নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত তরীকা মুতাবেক হয়। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম-এর তরীকা মুতাবেক না হলে তা অগ্রাহ্য ও বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে প্রচলিত পন্থা ছাড়া জায়িয পদ্ধতিতে কেউ মীলাদ পড়তে চাইলে তার নিয়ম এই যে, কোন একজন হক্কানী আলেম রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম এর জীবনাদর্শ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ দিকসমূহ আলোচনা করবেন। বিভিন্ন কাজের সুন্নাত তরীকা বর্ণনা করবেন এবং রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম-এর উপর দরূদ শরীফ পড়ার ফযীলত বর্ণনা করবেন। অতঃপর হাযেরীনগণ প্রত্যেকেই পৃথক পৃথক ভাবে অন্তরে মুহব্বতের সাথে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম-এর উপর ঐ সকল দরূদ শরীফ পাঠ করবেন যা হাদীসে বর্ণিত আছে। যা হক্কানী উলামায়ে কেরামের আমল থেকে জানা গেছে। পরিশেষে আলেম সাহেব সকলকে নিয়ে দু’আ করবেন।
- والله اعلم باالصواب -
সুত্র
- ওয়াফায়াতুল আ’য়ান, খন্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১১৭
- ই’তেসাম, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১১৪
- ফাতাওয়ায়ে রাহিমীয়া, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৮৩
- আহসানুল ফাতাওয়া, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৪৭
- আহসানুল ফাতাওয়া, খন্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪৪৯
- ইমদাদুল আহকাম, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৯৫
- ফাতাওয়ায়ে মাহমূদিয়্যাহ, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮৮
- জাওয়াহিরুল ফিকাহ, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২১১
- কিফায়াতুল মুফ্তী, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৫০
- মুসলিম শরীফ, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৭৭
- আবূ দাঊদ শরীফ, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৭১০
- আযীযুল ফাতাওয়া, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৯৮
- রাহে সুন্নাত, পৃষ্ঠা: ২৫৩
- তাফসীরে কবীর, খন্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২৪৩
- আল-ফাতহুর রব্বানী, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৪
- তালবীসে ইবলীস, পৃষ্ঠা: ৯
- মিশকাত, পৃষ্ঠা: ২৭
- মিশকাত, পৃষ্ঠা: ৪০৩
- মাজালিসে আবরার, পৃষ্ঠা: ২১৩
- ইবনে মাজাহ শরীফ, পৃষ্ঠা: ২
- ফাতাওয়া রশীদিয়া, পৃষ্ঠা: ২২৯